২০২৫-২৬ অর্থবছর

রাজস্ব ৫ লাখ কোটি টাকার ঘরে ব্যয় ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটি

সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ ও সরকারি ব্যয়—উভয় ক্ষেত্রেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে থেকেছে সরকার।

লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আহরণ হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধীরগতির কারণে মোট সরকারি ব্যয়ও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা কম হয়েছে। ফলে বরাবরের মতোই পূর্ণাঙ্গ বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা এবং উন্নয়ন ব্যয়ে স্থবিরতা সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে সীমিত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি ও প্রবৃদ্ধির গতিকেও বাধাগ্রস্ত করছে।

অর্থ বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৪ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কর রাজস্ব এসেছে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা এবং কর-বহির্ভূত রাজস্ব ৭৬ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে রাজস্ব আহরণ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

অন্যদিকে একই সময়ে সরকারের মোট ব্যয় হয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা বাজেটের ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা কম। মোট ব্যয়ের মধ্যে পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে প্রায় ৮৪ শতাংশ।

রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় সরকারকে সার্বিক ব্যয় পরিকল্পনায়ও সমন্বয় আনতে হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে উন্নয়ন ব্যয়ে। বিদায়ী অর্থবছরে উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, যদিও এ খাতে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য ছিল। বিপরীতে বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয় ও ঋণের সুদ পরিশোধের মতো পরিচালন খাতেই খরচ হয়েছে মোট ব্যয়ের বড় অংশ।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ২০২৫ সালের জুনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা করে। অর্থবছরের প্রথম আট মাস বাজেট বাস্তবায়ন হয় তাদের অধীনে। পরবর্তী চার মাসের দায়িত্ব নেয় বর্তমান বিএনপি সরকার। তবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১১ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। এর ফলে চলতি অর্থবছরেই সরকারকে অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। একই সময়ে সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্থরতা রাজস্ব আহরণের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিদ্যমান সংকট সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় গত অর্থবছরে প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আয় হয়েছে। এ বড় ঘাটতি কেবল অর্থনৈতিক মন্দা বা ব্যবসায়িক স্থবিরতার ফল নয়; এটি কর প্রশাসনের দুর্বলতা, কর ফাঁকি, সীমিত করজাল এবং রাজস্ব আহরণে নীতিগত অদক্ষতারও প্রতিফলন। কর রাজস্ব মোট আয়ের প্রধান উৎস হওয়া সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব সংগ্রহে ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে সরকার অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজস্বনীতি বাস্তবায়নে সফল হয়নি। ফলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

সরকারের ব্যয়ের বড় অংশ প্রশাসনিক ও নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে তেমন উৎসাহিত করে না উল্লেখ করে এ অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ‘ব্যয়ও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা কম হওয়ায় প্রশ্ন ওঠে, সরকার কি আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি, নাকি প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা ও ধীরগতির কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এ পরিসংখ্যান সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত দক্ষতার ঘাটতি, দুর্বল রাজস্ব আহরণ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। অর্থনীতিকে টেকসইভাবে শক্তিশালী করতে হলে কর ব্যবস্থার সংস্কার, অপচয় ও অনুৎপাদনশীল ব্যয় কমানো এবং উন্নয়ন খাতে অধিক কার্যকর বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।’

আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় প্রতি বছরই বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশীয় ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এর ফলে সরকারের ঋণের বোঝা এবং ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয় কমে যাওয়ায় অবকাঠামো নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে সরকারের প্রত্যাশিত সহায়তাও কমে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে ঘোষিত বাজেটের শতভাগ বাস্তবায়ন কখনই সম্ভব হয় না। প্রতি বছরই বাজেট বাস্তবায়নের গতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে গিয়ে বেড়ে যায়। শেষ মাসে তড়িঘড়ি করে ব্যয় বাড়ানোর কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে এবং সরকারি ব্যয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জন ব্যাহত হয়। এর আগের ২০২৪-২৫ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল ৭৯ শতাংশ।

বাজেট প্রণয়নের ধরনেই কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করেন সাবেক অর্থ সচিব ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই রাজস্ব আহরণ ও ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তব সক্ষমতার তুলনায় বেশি নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফলে অর্থবছর শেষে রাজস্ব আহরণ যেমন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারে না, তেমনি ব্যয়ও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় না। এতে বাজেটের কার্যকারিতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বাজেটের মূল উদ্দেশ্য জনগণের জন্য কার্যকর জনসেবা নিশ্চিত করা। তাই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সরকারের প্রকৃত আহরণ সক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে; বাজেটের আকার ঠিক করে পরে রাজস্বের লক্ষ্য চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়। একইভাবে শুরু থেকেই বাস্তবায়নযোগ্য ব্যয় পরিকল্পনা গ্রহণ করলে নীতিগত অসামঞ্জস্য কমবে এবং সরকারি ব্যয় আরো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। বাস্তবভিত্তিক রাজস্ব ও ব্যয়ের প্রাক্কলন না হলে বাজেট বাস্তবায়ন শেষ পর্যন্ত ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ পদ্ধতিতে চলতে থাকে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

সম্প্রতি জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা।

রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সরকার দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে ‘ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর ছাড় কমানো, পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট জোরদার, বকেয়া কর আদায়, মামলা নিষ্পত্তি, ই-পেমেন্ট ও ই-ফাইলিং সম্প্রসারণ, কাস্টমসে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা। পাশাপাশি বিলাসী ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যে শুল্ক-কর পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনাও রয়েছে।

আরও